
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি: ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়ায় অবস্থিত টাঙ্গন ব্যারেজের জল কপাট খুলে দিয়ে মৎস্য উৎসবের শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ৯ টায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে জল কপাট খুলে দেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব ফরহাদ হোসেন আজাদ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, উত্তরাঞ্চলের কৃষির উন্নয়ন এবং মৎস্য সম্পদের টেকসই বৃদ্ধিতে এ ধরনের প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টাঙ্গন ব্যারেজ শুধু সেচ প্রকল্পের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এর আশেপাশের জলাশয়গুলোকে কাজে লাগিয়ে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং টাঙ্গন ব্যারেজ প্রকল্পের মনোরম পরিবেশকে কেন্দ্র করে পর্যটন বিকাশেরও ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এখানে অ্যাম্রেড সেড, বসার বেঞ্চ, অস্থায়ী দোকান এবং একটি অস্থায়ী টিনসেড মসজিদ রয়েছে। পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে আরও নতুন বসার বেঞ্চ স্থাপন, গভীর নলকূপ, পাবলিক টয়লেট, বিনোদনের জন্য ওয়াকওয়ে এবং সেলফি পয়েন্ট স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এলাকার পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় যুবসমাজ ও মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, দেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এবং উৎপাদন খরচের হাত থেকে কৃষকদের মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যেই টাঙ্গন নদীর ওপর টাঙ্গন ব্যারেজ সেচ প্রকল্পটি গড়ে তোলা হয়। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা (বর্তমানে রুহিয়া উপজেলা) এবং পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলার সীমান্তবর্তী রামদিয়া নামক স্থানের চাপাতি মৌজায় টাঙ্গন নদীর ওপর এই প্রকল্প নির্মাণ করা হয়।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো আমন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে টাঙ্গন নদীতে একটি ব্যারেজ নির্মাণ ও কৃত্রিম জলাধার তৈরি করে ৪৪৫০ হেক্টর (প্রায় ১১০০০ একর) জমিতে সম্পূরক সেচ সুবিধা প্রদান করা এবং এর মাধ্যমে ৩০০০০ মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্য শস্য উৎপাদন করা।
১৯৮৩-১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হয়ে ১৯৯২-১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। টাঙ্গন নদীর উপর নির্মিত এই ব্যারেজের দৈর্ঘ্য ৩৫.৩৬ মিটার এবং এতে ৫টি রেডিয়াল গেট রয়েছে। এই সেচ প্রকল্পের আওতায় মোট ৬০৭০ হেক্টর (প্রায় ১৪৯৯৩ একর) এলাকা এবং ৪৪৫০ হেক্টর আবাদযোগ্য ও সেচযোগ্য এলাকা রয়েছে।
সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু কৃষিতেই নয়, বরং মাছ চাষ ও উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য ব্যবস্থাপনার এক আদর্শ মডেল হিসেবে এই জলাশয়টি গড়ে উঠেছে। প্রতি বছর এই জলাশয়ে প্রায় ১০০-১২০ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়, যার স্থানীয় বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। এর ফলে রুহিয়া উপজেলা ও আটোয়ারী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের শত শত মৎস্যজীবী পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক এর সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন, পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন, কৃষ্ণকমল চন্দ্র সরকার, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ঠাকুরগাঁও পওর সার্কেল, বাপাউবো, ঠাকুরগাঁও, মো: রফিউল বারী উপ প্রধান সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বাপাউবো, ঠাকুরগাঁও, ঠাকুরগাঁও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আতিকুর রহমান, রুহিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলাউদ্দিন, ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক চৌধুরী মোহেবুল্লাহ আবুনুর, রুহিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল জব্বার, সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম রিপন, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তুহিন, আটোয়ারী উপজেলা কৃষক দলের সদস্য সচিব মোকসেদ আলী, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ আইন বিষয়ক সম্পাদক এড. জাকির হোসেন জুয়েল, রাজাগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম নুরুসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, স্থানীয় মৎস্যজীবী ও বিপুল সংখ্যক সাধারণ কৃষক উপস্থিত ছিলেন।
উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজিত এই মৎস্য উৎসবে স্থানীয় জনগণের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। মৎস্য উৎসবকে কেন্দ্র করে মুখরিত হয়ে ওঠা এই সেচ প্রকল্পটি আজ শুধু কৃষিতেই নয়, বরং মৎস্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অনন্য রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।